সময়টা ২০০০ সাল। বাংলা ব্যান্ড সংগীতের তখন সুবর্ণ সময়। এমন সময়েই প্রকাশিত হলো ব্যান্ড দল দলছুটের অ্যালবাম 'হৃদয়পুর'। এর আগে ১৯৯৭ সালে তাদের 'আহ!' অ্যালবামটি প্রকাশিত হয়। তবে ব্যান্ডটির পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা অনেক গুণে বেড়ে যায় 'হৃদয়পুর' প্রকাশের পর। মোট ১২টি গান ছিল এই অ্যালবামে। সব গানই লিরিকাল ভ্যালুর দিক থেকে দুর্দান্ত। আর তার সঙ্গে কম্পোজিশনে যোগ হয়েছিল ভিন্নমাত্রা। সঞ্জীব চৌধুরী ও বাপ্পা মজুমদার প্রথাগতভাবে রকের দিকে গেলেন না। তারা বাংলা গানের মেলোডিকে আশ্রয় করেই তার সঙ্গে পপ বা ফোকের মিশ্রণ ঘটালেন। তার সঙ্গে কখনো কখনো যুক্ত হলো সফট বা মেলো রক।

শাহ আবদুল করিমের 'গাড়ি চলে না' গানটিতে পপের সঙ্গে ফোকের এক অনবদ্য সমন্বয় ঘটে। সে সময়ে গানটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায় ও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আজও গানটি তুমুল জনপ্রিয়। 'চড়িয়া মানবগাড়ি/ যাইতেছিলাম বন্ধুর বাড়ি/ মধ্যপথে ঠেকলো গাড়ি/ উপায়বুদ্ধি মিলে না'—লাইনগুলো আজও গুনগুন করেন শ্রোতারা। বন্ধুরা গাইতে থাকে তাদের আড্ডায়।

আবার, সফট রকে বাপ্পা মজুমদারের 'বাজি' তরুণ শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো গান। এটিও বেশ জনপ্রিয়। বাপ্পার গাওয়া 'জলের দামে' আবার যেমন আজও অনুরণন তোলে সব নিঃসঙ্গ হৃদয়ে। 'এখন এমন কেউ নেই যে আমার/ আঁধার এলে খুলে দেবে দুয়ার'—আমাদের নগরজীবনে মুনাফাস্বর্বস্ব পৃথিবীতে আমরা দিনশেষে এই অনুভূতি নিয়েই বাঁচি।

আবার, 'বৃষ্টি' কিংবা 'গাছ'-এর মতো গানগুলো খুব গভীর অনুভবের। শেখ রানার লেখা এই গান দুটো মনকে শীতল করে, নিবিড় এক বোধের জগতে নিয়ে যায়। এই অনুভূতি ব্যাখ্যাতীত। 'গাছ' গানটির কথায় আমরা দেখতে পাই—'খোলা আকাশ, একটি গাছ/ সবুজ পাতা, একটি গাছ/ স্মৃতির বৃক্ষ, পাতারা জানে নিজের চাষ-বাস/ কত যে কথা, এইটুকু গাছ/ কত যে কান্না, এইটুকু গাছ/ একটা সময়ের কিছু চিহ্ন/ দাগ কেটে যায়, কোথায় যেন/ একটি গাছ।'

'চাঁদের জন্য গান'-এ সঞ্জীব যখন গান 'আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ/ আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছিল চাঁদ'—তখন তা এক অপার্থিব অনুভূতি তৈরি করে। এই চাঁদ শুধু আক্ষরিক চাঁদ নয়, সে হতে পারে কারো প্রেয়সী, হতে পারে কারো জীবনের আলো। কিংবা হতে পারে এমন কেউ, যার প্রতি দূর থেকেই আমরা মুগ্ধ থাকি সারাজীবন, কিন্তু কাছে যাওয়া হয় না কখনো।

আবার 'সবুজ যখন' গানটিতে হালকা জ্যাজ ফ্লেভারের সঙ্গে একটা অন্যরকম সজীবতা পাওয়া যায়। বাপ্পা-সঞ্জীব দুজন মিলেই গেয়েছিলেন গানটি।

'নৌকা ভ্রমণ' গানটিতে উৎসব মুখরতার সঙ্গে রয়েছে আনন্দের স্মৃতি। আর আছে যান্ত্রিক জীবন থেকে দূরে গিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়ার আকুতি।

'চল বুবাইজান' আবার বলছে এদেশের শ্রমিকদের জীবনযাপনের কথা। পপ-ফোক ধাঁচে গাওয়া এই গানে আছে এদেশের শ্রমিক আর গ্রামের মানুষদের জীবনের চিরন্তন লড়াইয়ের গল্প। তবে তা বলা হয়েছে খুব সহজ করে, যাতে সবাই সহজেই বুঝতে পারেন। 'রেডিওতে খবর দিছে, দেশে কোনো অভাব নাই/ লাইল্লার ঘরে কাইল্লার ঘরে আনন্দের আর সীমা নাই/ জইস্যার মা কয় কাইস্যার মারে, আমরা কিছু বুজি না/ ও না না আমরা কিছু বুজি না/ চেরম্যান সাবে বগল বাজান, আমরা কিন্তু দেখছি না'—লাইনগুলো প্রাসঙ্গিক থেকে যাবে সবসময়ই।

'আন্তর্জাতিক ভিক্ষা সংগীত'-এ যেমন আছে হাস্যরসের ছলে এক ভিক্ষুকের জীবনের করুণ বর্ণনা। 'আল্লাহর ওয়াস্তে দুইডা ভিক্ষা দেন গো মা/ আমি অন্ধ ফকির বাবা, চোখে দেখি না হাবাগোবা/ ভাঙ্গা লাডি, ফুডা থালা/ হাতে হারিকেন, পিঠে ঝোলা/ আল্লাহর ওয়াস্তে দুইডা ভিক্ষা দেন গো মা'—এই লাইনগুলোতে যেমন আছে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের প্রকাশ, তেমনি আছে এসবের প্রতি তীব্র পরিহাস।

সঞ্জীব চৌধুরীর কথায় বাপ্পা মজুমদারের গাওয়া 'আমার সন্তান' গানটি খুলে দেয় আত্মসন্ধানের জানালা। 'পাহাড় থেকে পাথর কুড়াই, সাগর থেকে হাওয়া/ আমার সন্তান সে তো তোমার কাছে পাওয়া'—কথাগুলো আমাদের নিজের ভেতরের মানুষকে খুঁজে পাওয়া ও আত্মনির্মাণের অনন্য স্মারক। গানটির কম্পোজিশনে ব্লুজ নোটের প্রয়োগও ব্যতিক্রমধর্মী।

আর বিশেষ করে বলতে হয় সঞ্জীব চৌধুরীর লেখা ও গাওয়া 'তোমাকেই বলে দেবো' গানটির কথা। আজও এই গানটি দলছুটের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও হয়তো সবচেয়ে জনপ্রিয় গান। মেলো-রক ধাঁচের এই গানটিতে কথা, সুর ও গায়নের এক অসাধারণ মেলবন্ধন ঘটেছে। 'আমি কাউকে বলিনি সে নাম/ কেউ জানে না, না জানে আড়াল' কিংবা 'তুমি কান্নার রঙ, তুমি জোছনার ছায়া'—এই কথাগুলোর অসামান্য চিত্রকল্প প্রমাণ করে, সঞ্জীব খুব উঁচুমানের একজন কবি।

২০০০ সালে সাউন্ডটেকের ব্যানারে মুক্তি পাওয়া এই অ্যালবামটির বয়স ২৫ বছর পেরোলো। এত বছর পরে এসেও অ্যালবামটির গানগুলো এখনো সজীব, সতেজ। চিরসবুজ এই গানগুলো আজও শ্রোতাদের আত্মার অনেক কাছের। সেভাবেই থেকে যাবে আরও বহু বহু বছর।