সময়টা ২০১৩ সাল। নানান ঘটনার পরিক্রমায় তখন উত্তাল তারুণ্য। সে এক অন্যরকম সময়। সে সময়টাতেই প্রকাশিত হয় গানের দল সহজিয়ার প্রথম অ্যালবাম 'রঙমিস্ত্রী'। 

২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছবির হাটে প্রথম পারফরম্যান্সের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয় সহজিয়ার। পাঁচ সদস্যের এই ব্যান্ডে তখন ড্রাম বাজাতেন রাব্বি, বেজ গিটারে জাফরী, লিড গিটারে সজীব ও সৌম্য এবং ভোকাল রাজু। বর্তমানে লাইন-আপ প্রায় অপরিবর্তিত, তবে লিড গিটারে এখন রয়েছেন সজীব ও শিমুল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর 'রঙমিস্ত্রী' অ্যালবামটির প্রকাশনা উৎসব আয়োজন করা হয়েছিল। প্রকাশের পর পরই অ্যালবামটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়। একটা প্রজন্মের না বলা কথাগুলো যেন গানে গানে বলে দেয় সহজিয়া।

সে সময় ছিল ক্যাসেটের যুগ, 'রঙমিস্ত্রী' ছিল মোট ৯টি গান নিয়ে। এর ভেতর 'চোখে চোখ পড়লেই হাওয়া', 'ভুলে যাও শবনম', 'ব্যথা দিও না', 'বোকা পাখি', 'মা'—গানগুলো খুব জনপ্রিয়তা পায়। বাকি গানগুলোও জনপ্রিয় ছিল। 

যে সময়ে অ্যালবামটা বাজারে এলো, সে সময়েও ঢাকার রাস্তায় এলইডি বাতি আসেনি। রাতের ঢাকা শহর তখনো সিক্ত সোডিয়াম বাতির মায়াময় আলোয়। টিএসসিতে মেট্রোরেল স্টেশনটাও তখন ছিল না। তখনো অনেক জমজমাট 'ছবির হাটের' আড্ডা। তারুণ্য তখন উদ্বেলিত সহজিয়ার গানগুলো দিয়ে। 

তাদের এ ক্যাসেটের প্রতিটি গানই ছিল একেকটি কবিতা। 'এই হাওয়া তো উড়ায় নেয় চুল-টুল ধুলোবালি, শাহবাগ- আমার ফেরার বাস/ ভাল্লাগে না, থাক আজ বাড়ি ফেরা/ তোমাকে রেখে ফিরে যাওয়া'- 'চোখে চোখ পড়লেই হাওয়া' গানের এই কথাগুলো সে সময় কিংবা এ সময়- দুই সময়ের ঢাকাকেই পরিচিত করে তার নিজ ঢঙে। প্রথম প্রেমের স্নিগ্ধ অনুভূতি কিংবা ঢাকা শহরের জ্যাম, পাবলিক বাস আর অন্তহীন ধুলো-বালি- সবকিছু নিয়েই আমাদের জীবন এগিয়ে যেতে থাকে। 

'ব্যথা দিও না' গানে 'সারা রাত জেগে জেগে আয়না কোনো কথা বলে না/ এত বড় শহর কেন একটুও রাতে ঘুমোতে দেয় না' কিংবা 'সংগ্রহে রাখা থাকা গানের কথা মনে পড়ে না/ সন্ধ্যা নদীর পথে বহুদিন হলো হাঁটতে যাই না/ শব্দ লেখা শেখা দেখার খাতা হারিয়ে গেলে/ তুমিও ভাবছ কেন এখনি যাবে পথটা ফেলে'- লাইনগুলো যদি আমরা ভালোভাবে খেয়াল করি, তবে দেখব আমাদের এই 'জীবন চলার পথের পুরো সময়টায় আমরা এমন অনেকেই অনেককিছু ফেলে এসেছি, যা আমাদের আর কখনো ফিরে পাওয়া হয় না। কিন্তু সেই বদলে যাওয়ার কষ্টটা থেকে যায়, স্মৃতি হিসেবে নস্টালজিয়া জাগাতে থাকে প্রতিনিয়ত। 

'ভুলে যাও শবনম' আবার আমাদের শেখায় লড়াই করতে, আত্মপ্রত্যয়ী হতে। 'ভুলে যাও শবনম/ দাগগুলো মুছে ফেলো/ সংকট স্বীকার করে নাও'- এই স্বীকার করে নেয়াটা সবসময়ই জীবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। 'সম্পূর্ণ গান আমি জানিনা' কিংবা 'একদিন পাহাড়ের বুকে বাঁচবই/ ততদিন ভালো থেক, আমাকে গান লিখ/ যদি ফিরে পাও'- কথাগুলো আমাদের জানায়, সবকিছু আমাদের হাতে নেই, সবকিছুর সমাধান আমরা করতে পারব না, তবে হাল ছাড়লে চলবে না। লড়াই চালিয়ে যেতে হবে, সুদিন আসবেই। 

অ্যালবামের টাইটেল গান 'রঙমিস্ত্রী' বেশ আন্ডাররেটেড। 'তোমার আমার নিভে যাওয়ার আগে জল ধোয়া আগুন' কিংবা 'পথের পর নেই, তাই পথই আপন'  লাইনগুলো চিরায়ত। যেদিন সব বন্ধন ছিঁড়ে আমরা বেরিয়ে যাই বা বেরিয়ে যাই নিজেদের 'কমফোর্ট জোন' থেকে, তখন পুরো পৃথিবীটাই উন্মুক্ত থাকে আমাদের সামনে। আবার, ভেতরের বিষণ্ণতাকে ছাপিয়ে ওপরে ধরে রাখা ভণিতাকেও খুব ভালোভাবে তুলে ধরেছে গানটি। 

এই অ্যালবামের 'মা' গানটি বাংলা ভাষার মা সম্পর্কিত গানের ভেতর অন্যতম সেরা গান। 'ঘুমের পরীরা সব চোখে চোখে ওড়ে/ আমি মা জাগতে চাই তোমার শরীরে' কিংবা 'সব পথ একে একে যাচ্ছে চলে/ আমিও যাচ্ছি তুমি ডাকো নাই বলে, মা'- এই কথাগুলো গভীর অর্থবোধক। মানুষ সবকিছু ছাড়তে পারে, কিন্তু যতদিন মা তাকে আগলে রাখে বা মা থাকেন—ততদিন তার অন্তত একটা 'ফিরে যাওয়ার জায়গা' থেকে। এই টান মানুষ উপেক্ষা করতে পারেনা, এই অনুভূতি চিরায়ত।

অ্যালবামের সর্বাধিক আলোচিত 'বোকা পাখি' গানটির প্রতিটি লাইনই অনন্য। 'একটা বোকা পাখি হয়ে বসে থাকি/ ভাবনা রাখি শুকনো ডালে এলোমেলো হাওয়া' কিংবা 'ছোট-ছোট ঘর ও উঁচু উঁচু বাড়ি/ কারফিউ ডাকে ওঠো তাড়াতাড়ি/ হাতের মুঠোয় এক গ্লাস জাদু/ এক টান নীল বিষ বুকে নিয়ে ফিরি'- প্রতিনিয়ত নিজেদের ভেতরে বয়ে নিয়ে চলা এই অন্তর্ঘাত এক যুগ আগেও যেমন সত্য ছিল সে প্রজন্মের জন্য, তেমনি এই অনুভূতি চিরায়ত ও সত্য—আমাদের বর্তমান প্রজন্মের জন্যও।

'কিছুই ছাড়ছি না/ কিছুই ধরছি না/ ধরা দিচ্ছে না'—এই কথাগুলো 'ব্যাখ্যা' করে আমাদের নিত্যকার সংকটকে। আমরা অনেক কিছু করছি, কিন্তু না করলেই বা কী হতো? যা কিছুর পেছনে ছুটছি, ছুটে কী পাচ্ছি? অথবা কিছুই করা হয়ে উঠছে না। এভাবেই জীবন কেটে যাচ্ছে।

'ছুরি হাতে নিয়ে ধার দেই তাতে/ খুঁজছি ধারালো সান্ত্বনা/ আয়নায় রেখে রেখে নিজেকে দেখে / কিছুই করতে পারছি না'—একেবারে শিউরে ওঠার মতো লাইন। নিজেকে শেষ করে দিতে চাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষাও একসময় প্রশমিত হয়ে আক্ষেপ আর অসহায়ত্বের রূপ নেয়। 

'কেউ তো ডাকে না/ আমি ফিরছি না, কোথাও যাচ্ছি না/ স্বপ্নে যে তাই আসা-যাওয়া'—আমাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার, সব বন্ধন থেকে মুক্ত হতে চাওয়ার চিরন্তন অভিপ্রায় প্রকাশিত এই লাইনগুলোতে।

একটা সময়ের পর আর লড়াই করতে ইচ্ছা করে না, কেউ হারিয়ে যায়, কেউ পরাজয় মেনে নেয়, কেউ বদলে ফেলে নিজেদের। কিন্তু জীবনের নানান পর্যায়ে, এর পরতে পরতে এই অনুভূতিগুলো জাগ্রত থাকে। হাহাকারগুলো যেমন হারিয়ে যায় না, তেমনি মরে যায় না সব স্বপ্নগুলোও। সহজিয়া 'রঙমিস্ত্রী'তে আমাদের তেমনই কিছু গান শোনায়। এক যুগ পরে এসে মনে হয়, সেদিনের সেই সোডিয়াম বাতির স্নিগ্ধতা আর নেই, দিনগুলোও চোখের পলকে হাওয়া হয়ে গেলো, তবে থেকে গেলো গানগুলো, থেকে যাবে আরও বহুদিন।